2>|| স্বামীজীর খাদ্যভিক্ষা ||

    2>|| স্বামীজীর খাদ্যভিক্ষা ||

          (সংগ্রহীত)

একবার স্বামীজি স্থির করেছিলেন খাদ্যভিক্ষা করবেন না। ফলে মাঝে মাঝে উপবাসে কাটাতে হতো। একবার দুদিন অনাহারে আছেন, এমন সময় এক বড়লোকের ঘোড়ার সহিস তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, "সাধুবাবা, কিছু ভোজন হয়েছে?” এরপর দয়াপরবশ হয়ে সহিস কয়েকটা রুটি ও ঝালচাটনি খেতে দিলেন। এই চাটনিতে এত ঝাল যে দু'দিন উপবাসের পর ওটা খেয়ে তিনি পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন। সহিসও খুব বিপদে পড়ে গিয়েছে! এমন সময় একটা লোক মাথায় ঝুড়ি নিয়ে যাচ্ছিল। স্বামীজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ঝুড়িতে কি আছে? লোকটি বললো, তেঁতুল। "এই তো চাই!” ঐ তেঁতুল খেয়ে স্বামীজির পেটের যন্ত্রণার নিবৃত্তি হলো।


আলমোড়ার উপকণ্ঠে ক্ষুধা ও পথশ্রমে ক্লান্ত স্বামীজিকে একবার ভূমিশয্যা নিতে হয়েছিল , সামনেই গোরস্থান। একজন ফকিরের দয়ায় সেবার স্বামীজি বেঁচে গেলেন। দয়াময় ফকিরটি একফালি শশা এনে সন্ন্যাসীর হাতে দিলেন। পরে বিবেকানন্দ স্বীকার করেছেন, "আমি আর কখনও ক্ষুধায় এতটা কাতর হইনি!"


আর সেই বিখ্যাত গল্পটি, হাতরাস স্টেশনে রেলকর্মচারী এবং ভবিষ্যৎ শিষ্য শরৎ গুপ্তর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকার। সন্ন্যাসীকে দেখে সহকারী স্টেশন মাস্টারের প্রশ্ন: "স্বামীজি আপনি কি ক্ষুধার্ত?” সাধু: "হ্যাঁ।" শরৎ: "তবে দয়া করে আমার ঘরে আসুন।” সাধু: "আপনি কি খেতে দেবেন?” শরৎ একটি উর্দু কবিতা আউড়ে বললেন, "হে প্রিয়, তুমি আমার ঘরে এসেছ, আমি সুন্দর মসলাসহ আমার কলিজাটা রেঁধে আপনাকে খাওয়াব।।”


পরিব্রাজক জীবনের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা স্বামীজি তুলনাহীন ভাষায় পরবর্তীকালে তাঁর ভক্তদের শুনিয়েছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। "কতবার আমি অনাহারে, বিক্ষতচরণে, ক্লান্তদেহে মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছি। কতবার দিনের পর দিন এক মুষ্টি অন্ন না পেয়ে পথচলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।


তখন অবসন্ন শরীর বৃক্ষচ্ছায়ায় লুটিয়ে পড়তো, তখন মনে হতো প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাচ্ছে, কথা বলতে পারতাম না, চিন্তাও অসম্ভব হয়ে পড়তো; আর অমনি মনে এই ভাব উঠতো, আমার কোনো ভয় নেই, মৃত্যুও নেই; আমার জন্ম কখনও হয়নি, মৃত্যুও হবে না; আমার ক্ষুধা নেই, তৃষ্ণা নেই। সারা প্রকৃতির ক্ষমতা নেই আমায় পিষে মারে। প্রকৃতি তো আমার দাসী। হে দেবাদিদেব, হে পরমেশ্বর, নিজ মহিমা প্রকাশ কর, স্বরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হও। উত্তিষ্ঠত জাগ্রত! বিরত হয়ো না। অমনি আমি পুনর্বল লাভ করে উঠে দাঁড়াতাম। তাই আমি আজও বেঁচে আছি।"


অনাহারের ভয় যার চলে গিয়েছে জগৎসংসার তাকে আর অন্য কোনো ভয় দেখতে পারে না। এইটাই সর্বহারা মানুষের উপরি পাওনা।


একবার উত্তরভারতে স্বামীজি একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একজন অসৎ থানাদার তাঁর পিছনে লাগলো, কয়েদ করবার ভয় দেখাল। পরিব্রাজক বিবেকানন্দর মন তখন অতি বিষণ্ণ, তিনি ভয়শূন্য মনে বললেন, "চলুন না। এরূপ অনিশ্চিত অনাহারে থাকার চেয়ে তবুও থানায় দু'বার খেতে পাওয়া যাবে, সেতো ভাল কথা।"


স্বামীজির দীর্ঘতম উপবাসের মেয়াদ কত? এ-প্রশ্ন উঠতেই পারে। তার সোজাসুজি উত্তরের সন্ধানও পাওয়া গিয়েছে। এক-আধদিন উপবাসকে স্বামীজি সবসময় উপেক্ষা করেছেন, তবে ঈশ্বরের দয়ায় কখনও তিনদিনের বেশি উপবাস করতে হয়নি।


অনাহারের আশঙ্কা কিন্তু সন্ন্যাসী বিবেকানন্দকে কখনও দমিয়ে রাখতে

পারেনি। ১৮৯০ সালে ডিসেম্বরের এক সন্ধ্যায় পরিব্রাজক বিবেকানন্দ কয়েকজন গুরুভাইকে নিয়ে মীরাটে হাজির হলেন। মীরাট শহরের ২৫৯ নম্বর রামবাগে লালা নন্দরাম গুপ্তর বাগানবাড়িতে ক'দিন ছিলেন। আফগানিস্থানের আমীর আব্দার রহমানের জনৈক আত্মীয় সেবার সাধুদের পোলাও খাওয়ানোর জন্য কিছু টাকা দেন। স্বামীজি উৎসাহভরে পোলাও রান্নার দায়িত্ব নেন। অন্যদিনেও স্বামীজি মাঝে-মাঝে রান্নায় সাহায্য করতেন। স্বামী তৃরীয়ানন্দকে খাওয়ানোর জন্য একদিন নিজে বাজার থেকে মাংস কিনে আনেন, ডিম যোগাড় করেন এবং উপাদেয় সব পদ প্রস্তুত করেন।


মীরাটে স্বামীজি তাঁর গুরুভাইদের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ এবং সেইসঙ্গে পোলাও কালিয়া রান্না শেখাতেন। একদিন পোলাও রেঁধেছেন।

মাংসের কিমা করিয়েছিলেন, কিছু শিক্ কাবাব করবার ইচ্ছা। কিন্তু শিক পাওয়া গেল না। তখন মাথা ঘামিয়ে স্বামীজি সামনের পিচগাছ থেকে গোটাকয়েক ছোট ডাল ছিঁড়ে নিয়ে তাতেই কিমা জড়িয়ে দিয়ে কাবাব করলেন। সবাইকে খাওয়ালেন, নিজে কিন্তু খেলেন না। বললেন, "তোমাদের খাইয়ে আমার বড় সুখ হচ্ছে।”


তবে স্বদেশের অনশন অপেক্ষা বিদেশের অনশন-আশঙ্কা যে অনেক বেশি আতঙ্কজনক তা বুঝতে কারও কষ্ট হয় না। মেরি লুইস বার্ক-এর বিখ্যাত বইতে মার্কিনপ্রবাসী বিবেকানন্দের একটি মর্মস্পর্শী টেলিগ্রামের উল্লেখ আছে। বোস্টন থেকে বিবেকানন্দ এটি পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন মাদ্রাজে প্রিয় শিষ্য আলাসিঙ্গা পেরুমলকে না খেয়ে রয়েছি! সমস্ত টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। অন্তত দেশে ফিরে যাবার মতন কিছু টাকা পাঠাও। 


দু'দিন পরে শিকাগোতে যিনি ঝড় তুলবেন এবং বিশ্ববিজয়ী হবেন, তিনি প্রবাসে অনাহারে মৃত্যুর মুখোমুখি। বড় ভীষণ জায়গা এই মার্কিন দেশ। এখানে ভিক্ষা করা অপরাধ, ভিক্ষা চাইলে জেলবাস অনিবার্য!

স্বামীজি অবশেষে খ্যাতি, সম্মান ও শ্রদ্ধার মুকুট পরিধান করেছেন। কিন্তু প্রবাসে অর্থসমস্যার সমাধান সব সময় হয়নি। তাঁর সহযোগী আমেরিকান সাধক কৃপানন্দ একসময় নিউইয়র্ক থেকে গোপনে মিসেস ওলি বুলকে জানাচ্ছেন: "স্বামীজি নিজেই ঘরভাড়া, বিজ্ঞাপন দেওয়া, ছাপানো ইত্যাদি খরচ বহন করছেন। এই সব খরচ বহন করতে গিয়ে অনেক সময় না খেয়ে থাকেন-হি স্টার্ভস্ হিমসেলফ। কিন্তু তিনি দৈত্যের মত খাটেন।"

        ( সংগ্রহীত)

=====================

Comments

Popular posts from this blog

1>স্বামী বিবেকানন্দের উক্তি::--